মামলা থাকলে কি সরকারি চাকরি হয়? বাস্তবতা কি বলে!

মামলা থাকলে কি সরকারি চাকরি হয়? আমলা এবং আমলাতন্ত্র দেশ পরিচালনায় অতি পরিচিত দুটি শব্দ। আর এই আমলা বা সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগ প্রক্রিয়ার একদম শেষ ধাপে “মামলা থাকলে সরকারি চাকরি হবে হবে কিনা” এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। আমলা হচ্ছে মূলত সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত স্বায়ী কর্মকর্তা কর্মচারী। আমলারা জনপ্রতিনিধি নয়। তাই সরকার পরিবর্তন হলেও আমলাগণ চাকরিচ্যুত হন না। তাই আমলা নিয়োগের সময় তাদের ব্যক্তি জীবন, সামাজিক জীবন, নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ ইত্যাদি বিষয় গুলোকে খুব গুরুত্বের সাথে দেখা হয়।

সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়া মোটামুটি চারটি ধাপে সম্পূর্ণ হয়ে থাকে। ১. লিখিত পরীক্ষা, ২. ভাইভা, ৩. মেডিকেল টেস্ট ও  ৪. পুলিশ ভেরিফিকেশন। চার নাম্বার ধাপ অর্থাৎ পুলিশ ভেরিফিকেশন অংশেই প্রার্থীদের নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ অবক্ষয় হয়েছে কিনা সেটা দেখা হয়। আর তখনই সামনে আসে মামলা বিষয়টি। কারণ মামলা ভুক্ত আসামি যার নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ ঠিক নাই অর্থাৎ সে নিজেই অপরাধের সাথে যুক্ত সে কিভাবে দেশকে দুর্নীতি মুক্ত করবে আর কিভাবেই বা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করবে! তাই সরকারি চাকরির মাধ্যমে দেশ পরিচালনার অংশ হতে চাইলে অবশ্যই আপনাকে মামলা মুক্ত হওয়াটা খুব জরুরি।

আরও পড়ুন : চাকরির আবেদন পত্র লেখার নিয়ম বাংলা [Updated নিয়ম]

তবে মামলা থাকলেই যে আপনি সরকারি চাকরিতে যোগদান করতে পারবেন না বা পুলিশ ভেরিফিকেশন বাদ পরে যাবেন বিষয়টি কিন্তু এমনও নয়। এই আর্টিকেলে আমরা, মামলা থাকলে কি সরকারি চাকরি হয়, সরকারি চাকরিতে মামলার প্রভাব, মামলা থাকলে করণীয় এবং বাস্তবতা নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করবো। তাই আপনি যদি কোন কারণে মামলা ভুক্ত আসামি হয়ে থাকেন তাহলে এই পোস্টটি আপনার জন্য বেশ সহায়ক হতে পারে।

আরও পড়ুন :

মামলা বা কেস কি?

মামলা থাকলে সরকারি চাকরি হয় কিনা সেটি জানার পূর্বে মামলা কি, মামলা কত প্রকার এই বিষয় গুলো জানা বেশি জরুরি। কারণ মামলা মোকদ্দমা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান কম থাকার কারণে আমরা এই বিষয় গুলো নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে থাকি। এই অংশে মামলা সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ।

সহজ ভাষায় বললে, কোন কারণে কোন ব্যক্তির সাথে কোন অন্যায়, অবিচার, জুলুম, অত্যাচার ইত্যাদি করা হলে সেই ব্যক্তি কর্তৃক আদালতের কাছে সেই অন্যায়ের আইনি বিচার চাওয়ার আইনি প্রক্রিয়াকেই মূলত মামলা বলা হয়। এই মামলা থানায় এবং আদালত উভয় জায়গায় দায়ের করা যায়। মামলা প্রধানত দুই ধরণের হয়ে থাকে।

  1.  ফৌজদারি মামলা বা ক্রিমিনাল কেস।
  2.  দেওয়ানী মামলা বা সিভিল কেস।

হত্যা, ধর্ষণ, মারামারি, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি সহ সামাজিক অপরাধের জন্য ফৌজদারি মামলা হয়। এবং জমি-জমা নিয়ে বিরোধ, পারবারিক বিরোধ, অর্থ সংক্রান্ত বিরোধ ইত্যাদির জন্য দেওয়ানী মামলা হয়। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে শুধু মাত্র ফৌজদারি মামলা প্রভাব ফেলে বিধায় এই পোস্টে আমরা ফৌজদারি মামলা নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

ফৌজদারি মামলা কি?

সাধারণত ফৌজদারি মামলা করা হয় সামাজিক অপরাধের জন্য। সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যই মূলত ফৌজদারি মামলা বিধান চালু করা হয়েছে। হত্যা, ধর্ষণ, মারামারি, চুরি, ডাকাতি, নির্যাতন, অপহরণ, হত্যা চেষ্টা ইত্যাদি হচ্ছে সামাজিক অপরাধ। আর সমাজে এমন কোন অপরাধ সংগঠিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে আদালত বদ্ধ পরিকর। এমনকি অনেক সময় ভুক্তভোগী ব্যক্তি না চাইলেও আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে থাকেন সমাজ ও দেশের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য।

ফৌজদারি মামলা কত প্রকার কি কি?

অপরাধের ধরণের উপর ভিত্তি করে ফৌজদারি মামলা মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে।

  1.  জি.আর মামলা (GR case)
  2.  সি.আর মামলা (CR case)

জি.আর মামলা (GR case):

জি.আর (G.R) মামলা অর্থাৎ জেনারেল রেজিষ্ট্রার মামলা গুলো মূলত থানায় অভিযোগের মাধ্যমে করা হয়। ফৌজদারী কার্যবিধির তফসিল অনুযায়ী দন্ডবিধির আমালযোগ্য অপরাধ গুলোর ক্ষেত্রে সরাসরি থানায় অভিযোগের মাধ্যমে জি.আর (G.R) মামলা করা যায়। জি.আর (G.R) মামলা শুরু হয় ফৌজদারী কার্যবিধির ১৫৪ ধারা মতে প্রাথমিক তথ্য বিবরনির মাধ্যমে।

এই সব মমলায় ১৫৬ ধারা মোতাবেক পুলিশের এস আই বা ক্ষেত্র বিশেষে এ এস আই দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত করে থাকেন। এবং যদি মামলার সত্যতা পান তাহলে আদালতের আদেশ ব্যতিরেখেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেন। তবে এই ধরনরের মামলা কেবল মাত্র অপরাধ যে থানার আন্ডারে সংঘটিত হয়েছে সেই থানায় করতে হয়। 

সি.আর মামলা (CR case):

সি আর (CR case) বা কমপ্লেইন্ট রেজিস্ট্রার কেইস বা নালিশী মামলা মূলত সরাসরি আদালতের মাধ্যমে করা হয়। ফৌজদারী কার্যবিধির তফসিল অনুযায়ী দন্ডবিধির অ-আমালযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগি ব্যক্তি সরাসরি আদালতে এই ধরনের মামলা করে থাকেন। তখন আদালত একটি শুনানির মাধ্যমে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৯০ ধারা মতে মামলা গ্রহণ অথবা বাতিল করে থাকেন।

তারপর আদালতের কাছে মামলা সত্য মনে হলে আদালত সংশ্লিষ্ট থানাকে তদন্তের নির্দেশ দেন। অতঃপর সংশ্লিষ্ট থানা হতে এস আই বা ক্ষেত্র বিশেষে এ এস আই মামলার তদন্ত করে তদন্ত রিপোর্ট আদালতে জমা দেন। তদন্তে মামলার সত্যতা পাওয়া গেলে তখন পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। আর মামলার সত্যতা পাওয়া না গেলে আদালত মামলা বাতিল করে দেন।

মামলা থাকলে কি সরকারি চাকরি হয় ?

এতক্ষন আমরা আপনাদের মামলা কি, কত প্রকার সে সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত এবং স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। যাতে মামলা থাকলে সরকারি চাকরি হবে কি না সেটা বুঝতে সুবিধা হয়। চালুন এইবার মূল আলোচনা ‘মামলা থাকলে কি সরকারি চাকরি হয়’ এর মধ্যে ঢোকা যাক।

আমাদের মধ্যে অনেকেরই ধারণা মামলা থাকলেই মনে হয় সরকারি চাকরি হয় না। তবে ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। মামলা থাকলে চাকরি হবে কিনা সে বিষয়টি নির্ভর করে মামলার ধরণের উপর। আপনার নামে কোন ধরণের মামলা আছে তার উপর নির্ভর করবে আপনি সরকারি চাকরি করতে পারবেন কিনা।

আপনার নামে যদি কোন প্রকার ফৌজদারী মামলা অর্থাৎ ক্রিমিনাল কেস থাকে তবে আপনার সরকারি চাকরি হওয়ার স্বভাবনা খুব কম। এই ক্ষেত্রে আপনি লিখিত পরীক্ষা, ভাইভা খুব ভালো ভাবে দিলেও শেষ মুহূর্তে এসে আপনি বাদ পরে যাবেন । তবে আপনার নামে যদি দেওয়ানী অর্থাৎ জমিজমা সংক্রান্ত বা পারিবারিক কোন মামলা দেওয়ানী আদালতে চলমান থাকে তাহলে এই ধরণের মামলা সরকারি চাকরিতে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করবে না।

কারণ দেওয়ানী মামলাকে পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় ধর্তব্যের মধ্যে রাখা হয় না। অবশ্য এর কারণটাও স্বাভাবিক, কারণ জমি জমা থাকলে সে সংক্রান্ত টুকটাক প্রবলেম থাকবে এটাই প্রকৃতিক নিয়ম। তবে সর্বক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলা থাকলেই যে আপনি পুলিশ ভেরিফিকেশনে বাদ পড়বেন তা কিন্তু নয়।

কি ধরণের ফৌজদারী মামলা থাকলে সরকারি চাকরি হবে?

ফৌজদারী মামলা থাকলেই যে আপনার সরকারি চাকরি হবে না বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। আমরা উপরের আলোচনায় দেখিয়েছি ফৌজদারী মামলা মূলত দুই ধরণের হয়। আর সরকারি চাকরিতে যে প্রকার ফৌজদারী মামলা বাধা সৃষ্টি করে সেটা হচ্ছে জি.আর মামলা (GR case)। অর্থাৎ আপনার নামে যদি থানায় অভিযোগের মাধ্যমে মামলা হয়। তাহলে এই মামলার কারণে আপনি পুলিশ ভেরিফিকেশনে বাদ পরবেন। কিন্তু সি.আর মামলা (CR case) অর্থাৎ আদালতে মামলা পুলিশ ভেরিফিকেশনে কোন সমস্যা করেনা।

কারণ এই ধরণের মামলা গুলোর সত্য হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। তাই সি.আর (CR case) মামলা থাকলেই কাউকে সরকারি চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয় না। তবে সি. আর মামলায় আদালতের নির্দেশে আপনি যদি গ্রেফতার বা সাজা প্রাপ্ত হন তাহলে পুলিশ ভেরিফিকেশনে আপনার বাদ পরার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আর সর্বাবস্থায় জি.আর মামলা থাকলে বাদ পরার সম্ভাবনা প্রায় ৯৯%।

মামলার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন :

এতক্ষন আমরা তাত্ত্বিক বিষয়ে আলোচনা করলাম। এখন চলেন বাস্তবতার আলোকে পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক। সরকারি চাকরিতে যোগদানের এমদম শেষ স্টেজ হচ্ছে পুলিশ ভেরিফিকেশন। আর এই স্টেজে এসেই মূলত আপনার নামে কোন প্রকার ফৌজদারী মামলা আছে  কিনা বা ফৌজদারী দণ্ডবিধির কোন ধারায় সাজা প্রাপ্ত কিনা সেই বিষয়টি দেখা হয়।

আপনি যখন কোন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও ভাইভাতে উত্তীর্ন হবেন তারপর থেকেই পুলিশ ভেরিফিকেশণের কার্যক্রম শুরু হবে। প্রথমে ভেরিফিকেশনে দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা থানার রেকর্ড বুকে চেক করে দেখেন আপনার নাম কোন ফৌজদারী মামলা আছে কিনা। এই বিষয়টি এখন ডিজিটাল হওয়ায় অনলাইনে অনুসন্ধান করে তারা সহজেই জানতে পারে বাংলাদেশের কোথাও আপনার নামে কোন মামলা আছে কিনা। আপনার নামে যদি কোন মামলা পাওয়া যায় তাহলে সেটা কোন স্টেজে আছে সেটাও চেক করে দেখা হয়। যদি মামলা নিস্পত্তি হয়ে যায় তাহলে তো কোন সমস্যা নেই, কিন্তু মামলা যদি নিস্পত্তি না হয় তাহলে বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে।

থানায় মামলা চেক করার প্রক্রিয়া শেষ হলে আপনার এলাকার মেম্বার, চেয়ারম্যান বা কাউন্সিরের কাছ থেকেও এই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। সর্বশেষ দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তাগন আপনার নিজ এলাকায় স্বশরীরে গিয়ে তথ্য উপাত্ত নেওয়ার চেষ্টা করে। এই ধাপ গুলোর মধ্যে যদি আপনার নামে কোন ফৌজদারী জি. আর মামলার প্রমান পাওয়া যায় তখন তারা আপনার নামে নেগেটিভ রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেন। আর আপনার নামে যদি কোন ফৌজদারী জি. আর মামলার প্রমান না পাওয়া যায়। তখন তারা পজিটিভ রিপোর্ট পাঠিয়ে দেন। আর এই তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতেই মূলত নির্ধারণ হয় আপনি সরকারি চাকরি করতে পারবেন কি পারবেন না।

শেষ কথা :

আশা করি মামলা থাকলে সরকারি চাকরি হয় কি না সে বিষয়ে একটি স্পষ্ট ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছি। তবে ফৌজদারী জি. আর মামলা যেহেতু একটি সিরিয়াস বিষয় তাই আপনার নামে যদি এই ধরণের কোন মামলা থেকে থাকে তাহলে পুলিশ ভেরিফিকেশণের পূর্বেই সেটি নিস্পত্তি বা উভয় পক্ষে আপোষের মাধ্যমে সমাধান করে নিন। অন্যথায় আপনার স্বপ্নের সরকারি চাকরি হারাতে হতে পারে।

Visited 63 times, 1 visit(s) today

Leave a Comment