চাকরির বায়োডাটা লেখার নিয়ম [Updated নিয়ম]

কালের পরিক্রমায় বায়োডাটার ব্যবহার একদম সংকুচিত হয়ে আসছে। এক কালে ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত এই ফর্মাল ডকুমেন্টটির জায়গা বর্তমানে CV এবং Resume প্রায় পুরোপুরি ভাবে কভার করে ফেলেছে। আর দেশ ডিজিটালাইজেশনের কারণে এখন অধিকাংশ চাকরির আবেদন অনলাইনের মাধ্যমেই করা যায়। তাই সরকারি এবং কিছু কিছু কোম্পানিতে বায়োডাটা, সিভি বা Resume এর ব্যবহার নাই বললেই চলে। তবে এখন পর্যন্ত যতটুকু ব্যবহার রয়েছে তার উপর ভিত্তি করে এই আলোচনায় আমরা চাকরির জন্য বায়োডাটা কি, বায়োডাটা ও সিভির মধ্যে পার্থক্য এবং বায়োডাটা বা জীবন বৃত্তান্ত লেখার আধুনিক নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

আরও পড়ুন :

বায়োডাটা কি?

জীবনী বৃত্তান্তের সংক্ষিপ্ত রূপ হলো বায়োডাটা।  চাকরি, শিক্ষা এবং বিবাহের ক্ষেত্রে বর্তমানে এটি ব্যবহার করা হয়। একটি বায়োডাটায় সাধারণত ব্যক্তি জীবনের তথ্য গুলো উল্লেখ করা হয়।

যেমন, নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, বর্তমান ঠিকানা, স্বায়ী ঠিকানা, ধৰ্ম, জাতীয়তা, বৈবাহিক অবস্থা, শিক্ষা যোগ্যতা, শারীরিক বর্ণনা ইত্যাদি।বায়োডাটা মূলত একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনী তুলে ধরে।

এই কারনে কিছু কাল আগেও ব্যাপক হারে চাকরির জন্য বায়োডাটা ব্যবহার করা হতো।

বর্তমানে যার জায়গা সিভি বা রিজিউমে প্রায় দখল করে নিয়েছে বললেই চলে।

তবে চাকরির ক্ষেত্রে এখন নতুন করে বায়োডাটা ব্যবহার হয় না বললে খুব একটা ভুল হবে। তবে এখনো কিছু কিছু চাকরির ক্ষেত্রে কোম্পানি বায়োডাটা গ্রহণ করে থাকে।

তবে বর্তমানে বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়ে বায়োডাটা ব্যাপক হারে ব্যবহার হয়।

বায়োডাটা ও সিভির মধ্যে পার্থক্য:

এক দশক পূর্বেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ এবং নেপালে সিভির পরিবর্তে বায়োডাটা ব্যাপক হারে ব্যবহার করা হতো।

সে কারণে অনেকে এখনো বায়োডাটা এবং সিভি কে একই মনে করেন।

যদিও তাদের এই ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। বায়োডাটা এবং সিভির মধ্যে পার্থক্য রয়েছেন।

ব্যক্তি জীবনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনার নাম হলো বায়োডাটা বা জীবন বৃত্তান্ত। যা আমরা উপরে আলোচনা করেছি।

অন্য দিকে সিভি হলো এক জন ব্যক্তির জীবনের প্রবাহমান শিক্ষা, পেশাগত ঘটনা, অভিজ্ঞতার এবং অর্জনের সারসংক্ষেপ বর্ণনা।

এটি একজন ব্যক্তির জীবনের শিক্ষা অর্জন থেকে শুরু করে পেশাদার জীবনের ঘটনা, পরিবর্তন, সময় এবং অন্যান্য সকল পরিস্থিতি ও কার্যকলাপকে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরে ।

সাধারণ ভাবে বললে সিভি একজন ব্যক্তির পেশাগত জীবনের ঘটনা কে সমারাইজ করে প্রদর্শন করে।

যেখানে সিভি একজন ব্যক্তির অতীত থেকে বর্তমান উদ্যোগ, সফলতা, ব্যর্থতা, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, দক্ষতা এবং ছোট বড় অর্জন গুলোকে সমন্বয়ে করে প্রকাশ করে । সেখানে বায়োডাটা শুধু মাত্র ব্যক্তির পরিচয়, পারিবারিক পরিচয়, যোগাযোগের ঠিকানা, শারীরিক বর্ণনার, শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রের বিবরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

আবার উভয়ের প্রয়োগ ক্ষেত্রের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ ভাবে সিভি ব্যবহার করা হয় চাকরির ক্ষেত্রে নিয়োগ কর্তার কাছে নিজের যোগ্যতা প্রদর্শনের জন্য।

অন্যদিকে বায়োডাটা বর্তমানে বিবাহের মত ব্যক্তি পরিচয় দিতে হয় এমন সব ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।

সরলভাবে বলতে গেলে, বায়োডাটা বা জীবন বৃত্তান্ত এবং সিভি এর মধ্যে কিছু কমন মিল থাকলেও দুটি এক জিনিস নয়।

উভয়ের প্রয়োগ ক্ষেত্র থেকে শুরু করে বিবরণ গঠন বেশির ভাগই আলাদা।

বায়োডাটার গুরুত্ব:

উপরের আলোচনায় বায়োডাটা বা জীবনবৃত্তান্ত কি সে সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত জানাতে সক্ষম হয়েছি বলেই মনে করি। এবং আশা করছি আপনারা বায়োডাটার গুরুত্ব কিছুটা হলেও অনুমান করতে পারছেন।

তবুও এখানে আমরা এই বিষয়ে আপনাদের একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়া চেষ্টা করবো। বায়োডাটা একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত, পারিবারিক, এবং সামাজিক পরিচয় তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে।

বায়োডাটাতে যেহেতু একজন ব্যক্তির, পারিবারিক তথ্য থেকে শুরু করে শিক্ষাগত যোগ্যতা এমনকি রিলেটিভদের বর্ণনাও থাকে।

তাই বায়োডাটা খুব সহজেই কারো ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে।

বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়ে এই জিনিসটি খুবই গুরুত্বপূর্ন।  বায়োডাটার মাধ্যমে বর ও কনে উভয় পক্ষই দুই ফ্যামিলির ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক মর্যাদার সম্পর্কে একটি ধারণা পেয়ে যায়।

কিছু কিছু চাকরির ক্ষেত্রেও বায়োডাটা খুব গুরুত্বপূর্ন রোল প্লে করে।

নিয়োগকর্তা বায়োডাটার মাধ্যমে খুব সহজেই নিয়োগ প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ব্যক্তিগত বর্ণনা সম্পর্কে সহজেই একটি স্পষ্ট ধারণা পেয়ে যায়।

যা নিয়োগ কর্তাকে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করতে সাহায্য করে।

চাকরির বায়োডাটা লেখার নিয়ম:

বাংলাদেশে মূলত চাকরির দরখাস্ত এর সাথেই বায়োডাটা প্রেরণ করতে হয়। এবং দেশে যেহেতু এখনো চাকরির জন্য বায়োডাটা বা জীবন বৃত্তান্ত গ্রহণ করা হয়।

সেহেতু এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কিভাবে চাকরির জন্য একটি পেশাদার বায়োডাটা লিখতে হয় সে সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করবো।

যা আপনার নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সহজ করবে ইনশাল্লাহ।

বায়োডাটায় কি কি থাকে?

বায়োডাটা বা জীবন বৃত্তান্ত শব্দটি শুনেই কিছুটা অনুমান করা যায়, এখানে কি কি থাকবে। বায়োডাটায় সাধারণত ব্যক্তিগত তথ্যই থাকে।

তবে বায়োডাটা কোন কাজে ব্যবহার হবে তার উপর ভিত্তি করে এর কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে।

যেমন, চাকরির জন্য বায়োডাটাতে, প্রার্থীর ছবি, নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, বর্তমান ঠিকানা, স্বায়ী ঠিকানা, ধৰ্ম, জাতীয়তা, বৈবাহিক অবস্থা, মোবাইল নাম্বার, বর্তমান কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিশেষ ক্ষেত্রে শারীরিক বর্ণনা, রেফারেন্স ইত্যাদি থাকে।

আবার বিবাহের জন্য ব্যবহৃত বায়োডাটাতে উপরোক্ত তথ্য গুলোর সাথে, ফ্যামিলি মেম্বারদের বর্ণনা, ফ্যামিলির আর্থিক অবস্থা, ছেলে বা মেয়ের উচ্চতা, গায়ের রং, স্বাস্থ্য, বিশেষ ক্ষেত্রে আত্মীয় স্বজনদের বর্ণনাও উল্লেখ থাকে।

জীবন বৃত্তান্ত বা বায়োডাটা লেখার নিয়ম:

এই অংশে আমরা চাকরির জন্য একটি পেশাদার জীবন বৃত্তান্ত কিভাবে লিখতে হয় তার নিয়ম কানুন সম্পর্কে বিস্তারিত লিখার চেষ্টা করবো।

ডিজাইন এবং লেআউট:

একটি পেশাদার বায়োডাটা লিখার জন্য শুরুতেই এর ডিজাইন, ফন্ট, ফন্ট সাইজ ইত্যাদির উপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বায়োডাটা একটি প্লেন সাদা কাগজে লিখাই বেশি উত্তম।

আর জীবন বৃত্তান্ত তৈরী করার সময় হাতে লিখে বায়োডাটা তৈরী করার চিন্তা শুরুতেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে।

বায়োডাটা সব সময় কম্পিউটারে কম্পোজ করে তৈরী করার চেষ্টা করবেন।

বায়োডাটা তৈরী করার সময় পেজের চাকদিকে হাফ ইঞ্চি থেকে এক ইঞ্চি জায়গা বাদ দিয়ে বায়োডাটার মূল অংশটি লিখা শুরু করবেন।

হাফ ইঞ্চি থেকে এক ইঞ্চি জায়গা বাদ দেওয়ার পর বায়োডাটার শুরুতেই বড় করে একদম উপরের দিকে পেজেরে মাঝ বরাবর বায়োডাটা বা জীবন বৃত্তান্ত শব্দটি লিখে দিবেন।

এবং উপরের ডান কর্নারে আপনার একটি পাসপোর্স্ট সাইজের ছবি সংযুক্ত করে দিবেন।

এবং সেকশন গুলোতে বিভিন্ন কালারের রং ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকবেন।

আর চেষ্টা করবেন লেখা গুলো অভ্র এর পরিবর্তে বিজয় দিয়ে লিখতে।

এতে এতে বায়োডাটার প্রফেশনালিজম বৃদ্ধি পায়।

ব্যক্তিগত পরিচয় :

বায়োডাটাতে সর্ব প্রথম নিজের নামের লিখার মাধ্যমে আপনার পরিচয় দেওয়া শুরু করবেন।

এবং ক্রমানয়ে আপনার পিতার নাম, মাতার নাম, জন্ম তারিখ উল্লেখ করবেন।

ঠিকানা :

ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া শেষ হলে আপনার ঠিকানা লিখা শুরু করবেন। আপনার বর্তমান এবং স্বায়ী ঠিকানা যদি আলাদা আলাদা হয় তাহলে দুটি আলাদা করেই উল্লেখ করুন।

এই ক্ষেত্রে প্রথমে বর্তমান ঠিকানা লিখুন। তারপর স্বায়ী ঠিকানা লিখুন।

ঠিকানা লিখার ক্ষেত্রে প্রথমে গ্রাম /মহল্লা, তারপর ডাকঘর /পোস্ট, তারপর থানা তারপর জেলা এইভাবে উল্লেখ করুন।

অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য :

ঠিকানা লিখা শেষ হলে, আপনার অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য গুলো ধারাবাহিক ভাবে উল্লেখ করুন। যেমন, জাতীয়তা, ধৰ্ম, লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা, মোবাইল নাম্বার, ইমেইল ইত্যাদি।

মোবাইল নাম্বার, ইমেইল এড্রেস ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আপনার কাছে সবসময় থাকে এমন সচল মোবাইল নাম্বার, ইমেইল এড্রেস উল্লেখ করুন।

শিক্ষাগত যোগ্যতা :

অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য লিখা শেষ হলে আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা লিখা শুরু করুন। চেষ্টা করবেন সব কয়টি শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করার। তবে আপনি যদি উচ্চ শিক্ষিত হোন তাহলে PSC এবং JSC এর তথ্য না দেওয়াই উত্তম।

তবে আপনি SSC বা HSC পাস হলে এই তথ্য গুলো উল্লেখে করতে পারেন।

শিক্ষাগত যোগ্যতা লিখার সময় প্রথমে ডিগ্রির নাম, তারপর বোর্ডের নাম, তারপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম তারপর পাশের সন উল্লেখ করুন।

এবং প্রথমে সর্বোচ্চ ডিগ্রি তাপর ক্রমান্বয়ে নিচের ডিগ্রি গুলো উল্লেখ করুন।

অভিজ্ঞতা :

আপনি যদি পূর্বে কোন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে থাকেন তাহলে শিক্ষাগত যোগ্যতা লিখার পর আপনি আপনার অভিজ্ঞতা লিখতে পারেন।

এই ক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানের নাম, কি পদে কর্মরত ছিলেন, চাকরি সময় কাল উল্লেখ করতে হবে।

একাধিক অভিজ্ঞতা লিখার ক্ষেত্রে সর্বশেষ কোম্পানি থাকে ক্রমানয়ে আগের কোম্পানি গুলোর নাম উল্লেখ করতে হবে।

রেফারেন্স :

যে কোম্পানিতে আপনি আবেদন করবেন সেই কোম্পানিতে যদি আপনার কোন রিলেটিভ কর্মরত থাকে, অথবা প্রভাবশালী বা উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা কোন আত্মীয় যদি আপনার থাকে তাহলে তাদের নাম রেফারেন্স অংশ উল্লেখ করতে পারেন।

তারিখ ও স্বাক্ষর :

বায়োডাটার মূল অংশ লিখা শেষ হলে নিদিষ্ট জায়গায় আপনার স্বাক্ষর এবং তারিখ লিখে বায়োডাটাটি কমপ্লিট করুন।

স্বাক্ষরের তারিখ লিখার সময় আপনি যে তারিখে বায়োডাটাটি কোম্পানিতে প্রেরন করবেন সেই তারিখটি উল্লেখ করুন।

সংযক্তি :

প্রয়োজন বোধে বায়োডাটার একদম শেষে বায়োডাটার সাথে কোম্পানিকে আপনি কি কি কাগজ পত্র প্রদান করেন তার একটি তালিকা নিচে উল্লেখ করুন।

যেমন : সকল শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি, ছবি ইত্যাদি।

অভিনন্দন আপনি সফল ভাবে বায়োডাটা তৈরী করতে সফল হয়েছেন।

চাকরির বায়োডাটার ছবি :

চাকরির বায়ো ডাটা লেখার নিয়ম নমুনা

শেষ কথা :

বর্তমানে বায়োডাটার ব্যবহার বা চাহিদা কমে গেলেও এটি তৈরী করার সময় অবহেলা বা অবজ্ঞা করা মোটেও উচিত নয়।

চাকরির জন্য বায়োডাটা বা জীবন বৃত্তান্ত তৈরী করার সময় অবশ্যই এর প্রফেশনাল এবং আধুনিক নিয়ম অনুসরণ করা উচিত।

আশা করি আমরা  আপনাদের আধুনিক পদ্ধতিতে চাকরির বায়োডাটা লেখার নিয়ম সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা সক্ষম হয়েছি।

Similar Posts